গভীর রাত। হাতে স্মার্টফোন, উদ্দেশ্য ছিল একটি শিক্ষামূলক ভিডিও দেখা। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই ভিডিও বদলে যায় আরেকটিতে, তারপর আরও একটিতে। একসময় খেয়াল হয়—ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেছে, অথচ শেখা হয়নি প্রায় কিছুই। এই দৃশ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ক্রমেই সাধারণ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল সময় নষ্ট নয়—বরং একটি নতুন ধরনের মানসিক ও সামাজিক সংকট, যার নাম “ব্রেইন রড”।
২০২৪ সালে Oxford University Press “Brain Rot” শব্দটিকে বছরের সেরা শব্দ হিসেবে ঘোষণা করে। এই শব্দটি দিয়ে বোঝানো হয় এমন এক অবস্থা, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে নিম্নমানের ও দ্রুত বিনোদননির্ভর কনটেন্ট গ্রহণের ফলে মানুষের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং মনোযোগের স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যা একসময় অনলাইন স্ল্যাং ছিল, এখন তা গবেষণা-সমর্থিত বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশেও এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের তরুণরা প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করছে। এর মধ্যে বড় অংশ সময় চলে যাচ্ছে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও দেখায়—যেমন Facebook রিলস, TikTok এবং YouTube শর্টস। বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ের উল্লেখযোগ্য অংশ এমন কনটেন্টে ব্যয় হচ্ছে যা তাৎক্ষণিক বিনোদন দিলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো জ্ঞান বা দক্ষতা যোগ করছে না।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক একটি প্রবণতা। মানুষ স্বভাবতই এমন কনটেন্টের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যা কম মানসিক পরিশ্রমে দ্রুত আনন্দ দেয়। প্রতিটি ছোট ভিডিও মস্তিষ্কে ক্ষুদ্র পরিমাণে ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা ব্যবহারকারীকে আরও কনটেন্ট দেখার দিকে ঠেলে দেয়। এই প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে এক ধরনের আসক্তিতে পরিণত হয়। অন্যদিকে, বিশ্লেষণধর্মী বা শিক্ষামূলক কনটেন্টে মনোযোগ ধরে রাখতে বেশি সময় ও মানসিক শক্তি প্রয়োজন হওয়ায় অনেকেই তা এড়িয়ে চলেন।
এই অভ্যাসের একটি বড় অংশকে বিশেষজ্ঞরা “ডুম স্ক্রলিং” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ, উদ্দেশ্যহীনভাবে একের পর এক কনটেন্ট স্ক্রল করা। পরিসংখ্যান বলছে, একজন ব্যবহারকারী যদি প্রতিদিন গড়ে ২ ঘণ্টা স্ক্রল করেন, তাহলে বছরে তিনি প্রায় ১০০ কিলোমিটার সমপরিমাণ কনটেন্ট স্ক্রল করেন। কিন্তু এই সময়ের বিনিময়ে তিনি বাস্তব জীবনে কোনো উল্লেখযোগ্য দক্ষতা বা জ্ঞান অর্জন করতে পারছেন না।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের কনটেন্টে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের মনোযোগের স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে ৫ থেকে ৮ মিনিটের বেশি মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বই পড়ার ধৈর্যও কমে এসেছে—অনেকে কয়েক পৃষ্ঠার বেশি পড়তে পারছেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শেখার সক্ষমতা ও কর্মদক্ষতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। ব্যবহারকারীর আগ্রহ ও আচরণের ওপর ভিত্তি করে একই ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে আসতে থাকে। ফলে ব্যবহারকারী ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট ধরণের কনটেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন, যাকে “ইকো চেম্বার” বলা হয়। এতে করে নতুন বিষয় শেখার সুযোগ কমে যায় এবং চিন্তার বৈচিত্র্য সংকুচিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতার প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত নয়—সামাজিক ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তরুণদের মধ্যে ধৈর্য কমে যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রতি আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে এবং দ্রুত ফল পাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে সেনসেশনাল ও নিম্নমানের কনটেন্টের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পুরো কনটেন্ট ইকোসিস্টেমকে প্রভাবিত করছে।
তবে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা—নিজেকে প্রশ্ন করা, “আমি কি শিখছি, নাকি শুধু সময় কাটাচ্ছি?” পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং মানসম্মত কনটেন্ট বেছে নেওয়া জরুরি। ব্যবহারকারীরা চাইলে নিজেরাই অ্যালগরিদমকে প্রভাবিত করতে পারেন—নিম্নমানের কনটেন্ট এড়িয়ে চলা এবং শিক্ষামূলক কনটেন্টে বেশি সম্পৃক্ততার মাধ্যমে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের একটাই সতর্কবার্তা—সময় ও মনোযোগই আজকের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এই সম্পদ যদি অপ্রয়োজনীয় কনটেন্টে হারিয়ে যায়, তবে তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় পর্যায়েও পড়তে পারে।
এখন প্রশ্ন একটাই—প্রযুক্তি কি মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি মানুষই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে বন্দি হয়ে পড়বে?

Leave a Reply