বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া। ব্যাংক হিসাব তলব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া এসএমএস, অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে তাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ হতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাগুলোর সময়কাল ও ধারাবাহিকতা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
ব্যাংক হিসাব তলব করেছে ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়ার ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত তথ্য তলব করেছে।
এর পরপরই তিনি একটি সংবাদ সম্মেলন করে নিজের পরিবারের মোট নয়টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশ করেন, যার মধ্যে তার বাবা-মা এবং স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবও রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কোনো ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব তলব করা হলে তা সাধারণত সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের প্রাথমিক যাচাইয়ের অংশ হিসেবে করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তদন্তে শুধু ব্যাংক হিসাব নয়, বরং ঘোষণাবহির্ভূত সম্পদ, বেনামি অ্যাকাউন্ট বা অন্যের নামে পরিচালিত লেনদেনও যাচাই করা হয়।
বাংলাদেশে অতীতে অনেক রাজনৈতিক নেতাই হিসাব বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে তদন্তের মুখে পড়েছেন।
পুরনো এসএমএস ফাঁস ঘিরে নতুন বিতর্ক
ঠিক একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসিফ মাহমুদের একটি পুরনো এসএমএস তালিকা ফাঁস হয়।
এটি প্রকাশ করেন বিএনপি ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত নাজমুস সাকিব।
এসএমএস তালিকা ফাঁস হওয়ার সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এর কিছুদিন আগেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশের নিহত হওয়ার ঘটনার তদন্ত নতুন করে শুরু করার ঘোষণা দেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, ওই সময়ের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কল রেকর্ড ও এসএমএস তালিকা পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে।
ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এসএমএস তালিকাটি কি সেই তদন্তের অংশ, নাকি অন্য কোনো সূত্র থেকে এটি ফাঁস হয়েছে।
অর্থপাচার ও বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া চারটি দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন।
তবে এখন পর্যন্ত এই অভিযোগের বিষয়ে সরকারি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
এদিকে “নতুন ধারা বাংলাদেশ” দলের চেয়ারম্যান মমিন মেহেদী দাবি করেছেন, আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত সহকারী মাহফুজ প্রায় ৪৫০০ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন।
এ নিয়ে কয়েকটি অডিও রেকর্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুরনো চাঁদাবাজির অভিযোগ আবার আলোচনায়
গত বছর রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য সাম আক্তারের বাসায় চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া জানে আলম অপু নামে এক ব্যক্তির ভিডিও আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ভিডিওটিতে তিনি দাবি করেছিলেন, ওই ঘটনার পেছনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়ার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
যদিও গ্রেপ্তারের পর এই অভিযোগের তদন্ত খুব বেশি অগ্রসর হয়নি।
দুদকে দুর্নীতির অভিযোগ
বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে জমা পড়া দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়ার বিরুদ্ধে।
দুদকের একটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ জমা হয়েছে।
অনেক অভিযোগকারী নাকি ঘুষ নেওয়ার পর কাজ না করার অভিযোগও করেছেন এবং প্রমাণসহ অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার এবং অবৈধ বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগও তদন্তাধীন থাকতে পারে বলে জানা গেছে।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন
ফাঁস হওয়া এসএমএস তালিকায় তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু তথ্যও উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সেখানে তার সাবেক এক বান্ধবীর ব্যাংক হিসাবেও কিছু অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব তথ্যের সত্যতা সরকারি তদন্তে এখনো যাচাই করা হয়নি।
রাজনৈতিক সময়কাল নিয়ে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ—
- জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ হত্যার তদন্ত ঘোষণা
- সন্দেহভাজনদের কল রেকর্ড পুনরায় যাচাই
- পুরনো এসএমএস ফাঁস
- ঘনিষ্ঠদের অডিও ও ভিডিও প্রকাশ
সব মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক ঘটনা প্রবাহ তৈরি হয়েছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এর পেছনে রাজনৈতিক চাপ বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ইঙ্গিতও থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন,
“কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
শেষ কথা
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়াকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন।
যদি অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। আর যদি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, তাহলে তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সত্য উদঘাটনের জন্য স্বচ্ছ তদন্ত এবং নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply