পরপর তিন দিন দেশে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনমনে। সর্বশেষ আজ দুপুর ২টার দিকে ৫.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরা অঞ্চল। ধারাবাহিক কম্পনের ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—আতঙ্ক নয়, এখন প্রয়োজন প্রস্তুতি।
বাংলাদেশ কেন ভূমিকম্প ঝুঁকিতে?
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আক্তার জানান, বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বিশেষ করে ভারতীয় প্লেট ও বার্মা প্লেটের সীমারেখা দেশের পূর্বাঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করেছে।
সিলেট থেকে কক্সবাজার অঞ্চল এবং উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ—এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
তিনি বলেন:
“সাবডাকশন জোনে বিপুল শক্তি জমা হয়ে আছে। ভবিষ্যতে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো শক্তি সেখানে সঞ্চিত রয়েছে। প্রশ্ন শুধু সময়ের।”
তবে সাতক্ষীরার সাম্প্রতিক ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি মূল সাবডাকশন জোন থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে সংঘটিত হয়েছে। তাই এই নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলে তিনি মত দেন।
কেন ঢাকায় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেশি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের কেন্দ্র রাজধানী থেকে দূরে হলেও সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হতে পারে ঢাকায়। কারণ:
- অতিরিক্ত জনঘনত্ব
- অপরিকল্পিত নগরায়ন
- বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করা
- সরু রাস্তা
- দুর্বল জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা
- সচেতনতার অভাব
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ খান বলেন:
“৯০-এর দশকের আগে নির্মিত বহু ভবনে যথাযথ স্ট্রাকচারাল যাচাই হয়নি। বড় মাত্রার ভূমিকম্পে এগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”
লিকুইফ্যাকশন: নীরব বিপদ
ঢাকার আশপাশে ভরাট করা নরম মাটির ওপর গড়ে ওঠা বহু ভবন রয়েছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্পে মাটি তরল হয়ে যাওয়ার (লিকুইফ্যাকশন) ঝুঁকি থাকে। এতে ভবন হেলে পড়া বা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন: বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন ধসের পাশাপাশি গ্যাস লাইন ও বিদ্যুৎ সংযোগ বড় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অটো-শাটডাউন ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
ভূমিকম্পের সময় কী করবেন?
অধ্যাপক ড. আক্তারের পরামর্শ:
✔ হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামবেন না
✔ মজবুত টেবিল বা ভারী আসবাবের নিচে আশ্রয় নিন
✔ মাথা ও বুক সুরক্ষিত রাখুন
✔ লিফট ব্যবহার করবেন না
✔ কম্পন থামা পর্যন্ত ভেতরেই থাকুন
তিনি প্রস্তাব দেন, স্মার্টফোনভিত্তিক দুর্যোগ সচেতনতা অ্যাপ বা গেম তৈরি করে জনগণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে।
এখন কী করা জরুরি?
- পুরনো ভবনের স্ট্রাকচারাল অডিট
- কঠোরভাবে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন
- নিয়মিত মহড়া
- নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি
- গ্যাস লাইনে অটো-শাটডাউন ব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।

Leave a Reply