ক্রিকেটে ফাইনাল মানেই বাড়তি চাপ, স্নায়ুর লড়াই আর প্রতিটি মুহূর্তে উত্তেজনা। কিন্তু আহমেদাবাদের বিশাল নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল যেন অন্যরকম এক গল্প লিখল। প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার দর্শকে ঠাসা গ্যালারি, আর দেশের ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের প্রত্যাশার ভার—সবকিছু সামলে নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতল ভারত। ফাইনালের মতো মঞ্চে এত বড় ব্যবধানে জয় শুধু ম্যাচ জেতা নয়, বরং শক্তির প্রদর্শনও বটে। অনেকেই ভেবেছিলেন ভারত জিততে পারে, কিন্তু এতটা একতরফা ম্যাচ হবে—সম্ভবত ভারতীয় সমর্থকরাও তা কল্পনা করেননি।
টসের পর থেকেই ম্যাচের গল্প যেন ভারতের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব ভারতের ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান, আর সেই সুযোগটাকেই দারুণভাবে কাজে লাগান ভারতীয় ব্যাটাররা। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ম্যাচের গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে ভারত। মাত্র ছয় ওভারে তারা তুলে ফেলে ৯২ রান, যা টি–টোয়েন্টি ফাইনালের জন্য একেবারেই দুর্দান্ত সূচনা। এই ঝড়ো শুরুই আসলে ম্যাচের ভিত্তি গড়ে দেয়। পাওয়ারপ্লে শেষ হওয়ার আগেই নিউজিল্যান্ডের বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করে ফেলেছিল ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপ।
ইনিংস যত এগোতে থাকে, ভারতের আধিপত্য তত স্পষ্ট হতে থাকে। ১০ ওভার শেষে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় এক উইকেটে ১২৭। সেই মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছিল বড় একটি স্কোরের দিকে এগোচ্ছে তারা। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল। মাঝের ওভারগুলোতে কিউই বোলাররা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। ১৫ ওভার শেষে ভারতের রান ছিল ২০৩, এরপরের চার ওভারে তুলনামূলক ভালো বোলিং করে তারা মাত্র ২৮ রান দেয়। সেই সময় মনে হচ্ছিল হয়তো ভারতকে ২৩৫ বা ২৪০ রানের আশপাশে আটকে রাখা সম্ভব হতে পারে।
তবে শেষ ওভারে আবার ম্যাচের গতি বদলে দেন শিভম দুবে। তার ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ওই ওভারেই উঠে আসে ২২ রান, যা ভারতের মোট সংগ্রহকে অনায়াসেই ২৫০–এর ওপরে নিয়ে যায়। টি–টোয়েন্টি ফাইনালে এমন একটি লক্ষ্য প্রতিপক্ষের জন্য কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, তা ক্রিকেটপ্রেমীদের অজানা নয়। সেই মুহূর্তেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভারতের হাতেই।
২৫৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিউজিল্যান্ড শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। বড় লক্ষ্য তাড়া করতে হলে পাওয়ারপ্লে কাজে লাগানো জরুরি, কিন্তু ভারতীয় বোলাররা সেই সুযোগই দেয়নি। ফিন অ্যালেনকে আউট করে অক্ষর প্যাটেল প্রথম ধাক্কা দেন। এরপর প্রথম বলেই রাচিন রবীন্দ্রকে ফিরিয়ে দেন জাসপ্রিত বুমরাহ। এই দুই উইকেট নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের ভিত্তিই নড়িয়ে দেয়।
এরপর বোলিংয়ে ভারতের সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দেন জাসপ্রিত বুমরাহ। চার ওভারের স্পেলে মাত্র ১৫ রান দিয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন তিনি। এক সময় তার সামনে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। টি–টোয়েন্টিতে যখন প্রতিপক্ষকে ২৫৫ রানের মতো বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে হয়, সেখানে বুমরাহর মতো একজন বোলার চার ওভারে মাত্র ১৫ রান দিলে বাকি ওভারগুলোতে রান তোলা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার নিয়ন্ত্রিত বোলিং নিউজিল্যান্ডের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নিভিয়ে দেয়।
ব্যাটিংয়েও ভারতের হয়ে একাধিক খেলোয়াড় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শুরুতেই দ্রুত রান তুলে দলকে গতি এনে দেন ঈশান কিশান। ২৩ বলে তার ঝড়ো অর্ধশতক ভারতের ইনিংসকে দারুণভাবে এগিয়ে দেয়। সঞ্জু স্যামসনও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ৩৩ বলে ৫০ রান করে দলের স্কোরকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যান।
তবে ফাইনালের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে থাকে অভিষেক শর্মার ইনিংসটি। পুরো টুর্নামেন্টে খুব বেশি ছন্দে না থাকলেও ফাইনালের মঞ্চে তিনি যেন নিজের সেরাটাই তুলে ধরেন। মাত্র ১৮ বলে ৫০ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে ভারতের বড় স্কোরের ভিত্তিটাই তৈরি করে দেন তিনি। তার সেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পরেই অন্য ব্যাটারদের জন্য কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ভারতের জন্য একেবারেই একতরফা জয়ে পরিণত হয়। নিউজিল্যান্ড চেষ্টা করলেও বড় ব্যবধান কমানোর বাইরে তেমন কিছু করতে পারেনি। আর এই জয়ের মধ্য দিয়েই ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করে ভারত। টানা দ্বিতীয়বার টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে তারা প্রমাণ করেছে, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের ধারাবাহিকতা কতটা শক্তিশালী।
এই শিরোপা জয়ের মাধ্যমে ভারত টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনবারের চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, শিরোপা ধরে রাখার কীর্তিও তারা গড়েছে, যা আগে কোনো দল করতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের সাফল্যও চোখে পড়ার মতো। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপ কিংবা নারী ক্রিকেট—সব ক্ষেত্রেই ভারতীয় দল নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
ফাইনালে এমন দাপুটে জয়ের পর এখন ভারতজুড়ে উৎসবের আমেজ। ক্রিকেটপ্রেমীরা ইতিমধ্যেই নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন ভবিষ্যতের বড় টুর্নামেন্টগুলো নিয়ে। সামনে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ—সেই মঞ্চেও কি এই আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে ভারত? আপাতত সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।

Leave a Reply