অবশেষে বাংলাদেশে আলোচিত শহীদ শরিফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার দুই প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে ভারতে। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকার পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বনগাঁও সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের আটক করেছে দেশটির স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন ফয়সাল করিম ও আলমগীর হোসেন। ভারতীয় আদালত তাদেরকে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ড) নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই দুইজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ছেড়ে পালানো
তদন্তে উঠে এসেছে, শরিফ ওসমান হাদী হত্যার ঘটনার পরপরই অভিযুক্তরা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, তারা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত পথ ব্যবহার করে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে।
সীমান্ত পার হওয়ার পর তারা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারা আবার বাংলাদেশে ফিরে আসার পরিকল্পনাও করেছিল।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকার কারণে তাদের খুঁজে বের করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা নজরদারি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
ছদ্মনামে আত্মগোপন
গ্রেপ্তার এড়াতে দুই আসামিই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করছিলেন।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে—
- ফয়সাল করিম ভারতে নিজের নাম পরিবর্তন করে “রাহুল” নামে পরিচয় দিচ্ছিলেন।
- অপর আসামি আলমগীর হোসেনও একটি ভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার করে চলাফেরা করছিলেন।
এই ছদ্মনামের আড়ালে তারা দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছিল বলে পুলিশের ধারণা। স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে থাকার চেষ্টা করলেও তাদের চলাফেরা নিয়ে কিছু সন্দেহ তৈরি হয়েছিল বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে নজরদারিতে ছিল STF
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) বেশ কিছুদিন ধরেই এই দুইজনের গতিবিধি নজরে রেখেছিল।
তদন্তকারীরা জানান, একাধিকবার তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও অভিযানের আগ মুহূর্তে তারা সেখান থেকে সরে পড়তে সক্ষম হয়। ফলে তাদের গ্রেপ্তার করা সহজ ছিল না।
তবে শেষ পর্যন্ত একটি গোপন সূত্রের তথ্য পুলিশকে নিশ্চিত করে যে তারা বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে এবং সুযোগ পেলেই আবার বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করবে।
এই তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।
আদালতে তোলা ও ১৪ দিনের রিমান্ড
গ্রেপ্তারের পর রবিবার তাদের বিধাননগর আদালতে হাজির করা হয়। যদিও সেদিন আদালত পুরোপুরি খোলা ছিল না, তবুও দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক শুনানি শেষে দুইজনকে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন।
এই সময়ের মধ্যে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, সহযোগী কারা ছিল এবং কীভাবে তারা সীমান্ত পার হয়েছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই জিজ্ঞাসাবাদ থেকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা
ভারতীয় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া দুইজনের কাছেই কোনো বৈধ ভিসা বা পাসপোর্ট ছিল না।
এই কারণে ভারতের আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা
ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
বাংলাদেশ সরকার যদি আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে, তাহলে দুই আসামিকে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে বলে জানা গেছে।
তবে এর জন্য আইনি ও প্রশাসনিক কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। দুই দেশের সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরই মূলত বিষয়টি নির্ভর করছে।
তদন্তে নতুন অগ্রগতি
দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর এই দুই প্রধান সন্দেহভাজনের গ্রেপ্তারকে তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তকারীদের আশা, পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের পরিকল্পনা, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল এবং পুরো ঘটনার নেপথ্যে কী কারণ ছিল—সেসব বিষয় সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আসবে।
এখন সবার নজর থাকবে—
- জিজ্ঞাসাবাদে কী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে
- এবং দুই আসামিকে কবে নাগাদ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
শরিফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার এই নতুন অগ্রগতি নিয়ে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ এখন সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে।

Leave a Reply