ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তেহরানের একটি দাবি। ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, সংঘাতের পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিবেশী একটি দেশে কয়েকজন মার্কিন সেনাকে আটক করা হয়েছে। এই বক্তব্য সামনে আসার পরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা ও জল্পনা শুরু হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই ইরানের হাতে বন্দি মার্কিন সেনা, এই দাবি অস্বীকার করেছে। দুই পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি শুনেছেন একটি প্রতিবেশী দেশে কয়েকজন মার্কিন সেনা বন্দি হয়েছে। ইরানি শিক্ষার্থীদের সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি ঘটনাটির বিস্তারিত কিছু জানাননি। কোথায় বা কীভাবে ওই সেনারা আটক হয়েছে কিংবা তাদের সংখ্যা কত—সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট করেননি। তবুও তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে ইরানের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম তদারককারী যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এক মুখপাত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, মার্কিন সেনা বন্দি হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাদের মতে, এমন দাবি ইরানের প্রচারণার অংশ এবং অতীতেও একই ধরনের বক্তব্য তারা দিয়েছে।
এদিকে আলী লারিজানি এখানেই থেমে থাকেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফারসি ভাষায় প্রকাশিত আরেকটি বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন সেনা নিহতের প্রকৃত তথ্য গোপন করছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘাতে বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে, কিন্তু ওয়াশিংটন তা প্রকাশ করছে না। ভবিষ্যতে এসব মৃত্যুকে অন্য কোনো দুর্ঘটনার কারণ দেখিয়ে সামনে আনা হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এর আগেও লারিজানি ইরানের হামলায় বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। তবে সেই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য তথ্য তিনি উপস্থাপন করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনার সময় এমন বক্তব্য অনেক সময় মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় এবং জনমতকে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়।
ইরানি কর্মকর্তারা একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতিও সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, যদি কোনো আঞ্চলিক দেশ নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার সুযোগ দেয়, তাহলে তেহরান সেই ঘাঁটিগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরানের পাল্টা হামলায় এখন পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও ১৮ জন আহত হয়েছে। তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো মার্কিন সেনা বন্দি হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী এই দাবি পরিস্থিতিকে আরও ধোঁয়াশার মধ্যে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন অবস্থায় প্রকৃত তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং উত্তেজনা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের মধ্যেও আপাতত পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর সম্ভাবনার কথা বললেও বিচার বিভাগের শীর্ষ পর্যায় থেকে যুদ্ধকৌশল পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং ইরানি নেতৃত্ব বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান শত্রুপক্ষ ব্যবহার করছে এবং সেখান থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালিত হচ্ছে। সেই কারণে ওই অঞ্চলগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে ইরানের হাতে মার্কিন সেনা বন্দি হওয়ার দাবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক অস্বীকৃতি নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কোন দিকে গড়ায় এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়—সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply