সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথে বিএনপির অনাগ্রহ

সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথে বিএনপির অনাগ্রহ, রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক

জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপি তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেও এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন।

জাতীয় নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় এবং রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ–২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই একই সঙ্গে পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। কোরাম নির্ধারণ করা হয় ৬০ জন।

তবে শপথের দিন সকালে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন, কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন না। দলটির যুক্তি—বর্তমান সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংশোধন ছাড়া এমন শপথ সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

কোরাম পূরণ, তবে প্রশ্ন বহাল

একই সময়ে জামায়াত ও এনসিপির ৭৭ জন সদস্য দুই ধরনের শপথই গ্রহণ করেন। ফলে নির্ধারিত কোরাম পূরণ হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কোরাম পূরণ হলে পরিষদ আহ্বান করে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মঞ্জিল মরশেদ বলেন, প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত সদস্যসংখ্যা উপস্থিত থাকলে পরিষদ কাজ করতে বাধা নেই। অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ স্বাধীন মালিকের মতে, গণভোট কার্যকর হলে আলাদা পরিষদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। আদালত যদি এ বিষয়ে স্থগিতাদেশ দেন, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

বিএনপির সিদ্ধান্তকে জোট রাজনীতির ভেতরেও ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। এনসিপির নেতারা সামাজিক মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। জামায়াত নেতারাও প্রশ্ন তুলেছেন, পরিষদের শপথ ছাড়া সংসদীয় অংশগ্রহণের অর্থ কী।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সম্ভবত সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চায়। দলটির আশঙ্কা থাকতে পারে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে পরিষদের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার কঠিন হবে।

তবে বিএনপি বলছে, তারা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনেই এগোতে চায়। তাদের মতে, প্রথমে সংসদে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে পরিষদের কাঠামো স্পষ্ট করা উচিত, এরপর শপথ ও কার্যক্রম।

সামনে কোন পথ?

রাষ্ট্রপতির জারি করা অধ্যাদেশ সংসদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পেলে তা বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বিএনপি কি সংসদে জুলাই আদেশ অনুমোদনের উদ্যোগ নেবে, নাকি নিজস্ব সংশোধনী বিল আনবে?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি পরিষদ ও সংসদ পৃথক পথে অগ্রসর হয়, তাহলে দেশে কার্যত দ্বৈত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়বে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বর্তমানে পরিস্থিতি বিস্ফোরক না হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপা উত্তেজনা রয়েছে। বিএনপির সিদ্ধান্তকে কেউ আইনি সতর্কতা হিসেবে দেখছেন, কেউ দেখছেন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে।

সবশেষে প্রশ্ন রয়ে গেছে—বাংলাদেশ কি এখন সাংবিধানিক পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে, নাকি নতুন রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে যাচ্ছে? সময়ই হয়তো এর উত্তর দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.