বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির আড়ালে কর্মীদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত—এ প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। যশোর আইটি পার্কের ১২ ও ১৪ তলায় অবস্থিত দেশের অন্যতম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান Chaldal.com-এর কল সেন্টারে কর্মরত প্রায় ছয় শতাধিক কর্মী অভিযোগ করেছেন, তাঁদের চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। বেতন চাইতে গেলে চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।
“কারেন্ট কেটে গেছে, তিন দিন রান্না হয়নি”—এক কর্মীর কান্নাজড়িত কথা
প্রতিষ্ঠানটির এক নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্ট, যিনি প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে যোগ দিয়েছেন, বলেন—চার মাস ধরে বেতন না পেয়ে তাঁর পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
তিনি জানান,
“আমার বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়েছে। তিন দিন ধরে রান্না করতে পারিনি। বাসা ভাড়া, মেস ভাড়া, খাবারের বিল—সব বাকি পড়ে আছে। কারও কাছে ধার করার মতো অবস্থাও নেই।”
আরেক কর্মী দাবি করেন, মানবিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি এইচআর বিভাগের প্রধানকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ধার করা ৯ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। ডিসেম্বর মাসে মাত্র ৯০৫ টাকা আংশিক পেয়েছেন, বাকি অর্থ কীভাবে জোগাড় করবেন তা জানেন না। চরম হতাশা থেকে তিনি আত্মহত্যার আশঙ্কার কথাও লিখেছিলেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী,
“আমার মেসেজকে কোম্পানির বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি হিসেবে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, আমাদের বিরুদ্ধে জিডি করা হবে। আরও বলা হয়েছে—স্যালারি দিতে পারি, নাও দিতে পারি; কোনো গ্যারান্টি নেই। পারলে থাকেন, না পারলে রিজাইন দেন।”
অন্য এক কর্মী বলেন,
“জয়েন করার সময় আমাদের বলা হয়েছিল, প্রথম মাসের বেতন শুধু পেন্ডিং থাকবে। এরপর দ্বিতীয় মাস থেকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি এক টাকাও পাইনি।”
কর্মীদের অভিযোগ, বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট কোনো তারিখে বেতন পরিশোধ করা হয়নি। ফলে অনেকেই চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘদিনের কর্মীরাও একই সমস্যায়
দেড় বছর ধরে কর্মরত একজন বলেন,
“জয়েন করানোর সময় বলা হয়েছিল, প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু দেড় বছরে কখনোই ১০ তারিখে বেতন পাইনি। শুধু মিটিং করে তারিখ দেওয়া হয়, নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা নেই।”
অভিযোগ রয়েছে, এক বছর আগে চাকরি ছেড়ে দেওয়া অনেক কর্মীরও বকেয়া বেতন এখনও পরিশোধ করা হয়নি। কেউ বেতন চাইলে ‘টার্মিনেশন’ বা চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের।
পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে চরম প্রভাব
ভুক্তভোগীরা জানান, তাঁদের অনেকেই মেসে থাকেন। দুই থেকে তিন মাসের ভাড়া বাকি। অনেকে ধার-দেনা করে ও অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন।
এক কর্মীর ভাষ্য:
“আমার বাবা একজন কৃষক। পরিবারের দায়িত্ব আমার ওপর। মা অসুস্থ, ছোট বোন দুর্ঘটনায় আহত—সবকিছু সামলাতে হয়। বেতন ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব।”
কর্মীরা জানান, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাঁদের আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে চলতে পরামর্শ দিয়েছেন, যা মানবিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন তাঁরা।
কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য জানতে যশোর আইটি পার্কের ১৪ তলায় গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ উপস্থিত নেই বলে জানান দারোয়ান। ক্যামেরায় কয়েকজন কর্মকর্তাকে দেখা গেলেও কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে Chaldal.com-এর পক্ষ থেকে এখনও কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ই-কমার্স খাতে আস্থার সংকট
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত অতীতে বড় বিতর্কের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে Evaly ও Orange BD-কে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ জনমনে তাজা। বড় প্রতিষ্ঠানে বেতন বকেয়ার ঘটনা নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শ্রম আইন ও মানবিক দায়বদ্ধতা
শ্রম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মীদের বেতন পরিশোধ বাধ্যতামূলক। বেতন বকেয়া রেখে চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হলে তা শ্রম আইনের পরিপন্থী হতে পারে। শ্রম অধিকারকর্মীরা দ্রুত তদন্ত ও বকেয়া পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছেন।
দ্রুত সমাধান চান ভুক্তভোগীরা
কর্মীরা দাবি করেছেন:
“আমরা কাজ করেছি। আমাদের কষ্টের উপার্জন চাই। মানবিকভাবে বাঁচার অধিকার চাই।”
বর্তমানে শতাধিক কর্মী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের অনেকের বক্তব্য, সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে হতে পারে।
(এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগসমূহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে যুক্ত করা হবে।)

Leave a Reply